শুক্রবার, ০৩ এপ্রিল ২০২৬, ১০:২২ অপরাহ্ন
জিন্নাতুল ইসলাম জিন্না, লালমনিরহাট প্রতিনিধি::
অসম প্রেমের কারনেই হত্যাকান্ডের শিকার হয় লালমনিরহাটে হিন্দু সম্প্রদায়ের যুবক স্বপন চন্দ্র (২৫)। হত্যাকান্ডের সাত দিনের মধ্যেই রহস্য উদঘাটন করতে সমর্থ হওয়ায় লালমনিরহাট পুলিশ প্রশাসন সংবাদ সম্মেলন করেছে। হত্যা কান্ডের সাথে জড়িত ঘটনার মূল হোতা আনসার আলী মেম্বার ও তার স্ত্রী মূল পরিকল্পনাকারী অমিজা বেগমসহ আরো তিনজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
বুধবার (১৬ জানুয়ারী) বিকেলে লালমনিরহাট সদর থানার আয়োজনে এ সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন, লালমনিরহাট অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এ সার্কেল) মোহাম্মদ হাসান ইকবাল চৌধূরী।
মোহাম্মদ হাসান ইকবাল চৌধূরী সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বলেন, পুলিশ সুপার, লালমনিরহাট মহোদয়ের প্রদত্ত দিক-নির্দেশনা ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এ-সার্কেল) মোহাম্মদ হাসান ইকবাল চৌধুরী এবং অফিসার ইনচার্জ লালমনিরহাট থানা মোঃ মাহফুজ আলম এর সার্বিক তত্ত্বাবধানে তদন্তকারী কর্মকর্তা পুলিশ পরিদর্শক(এসআই) মোঃ মোজাম্মেল হক ঘটনার এক সপ্তাহের মধ্যেই উক্ত ক্লু-লেস হত্যাকান্ডের মোটিভ উদ্ধার, হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত আলামত (চাপাতি) উদ্ধারসহ হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত আসামীদের গ্রেফতার করে বিজ্ঞ আদালতে সোর্পদ্দ করেন। পরে গ্রেফতারকৃত আসামীদের চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে হাজির করলে আসামীগন বিজ্ঞ আদালতে স্বীকারোক্তি মুলক জবানবন্দি প্রদান করেন।
মামলার তদন্তে জানা যায়, লালমনিরহাট সদর থানার বড়বাড়ি ইউনিয়নের বিদ্যাবাগিশ এলাকার শ্রী বিনোদ চন্দ্র রায়ের ছেলে স্বপন চন্দ্র রায় (২৫), হত্যাকান্ডের শিকার হয়। স্বপন একজন দিনমজুর ও হিন্দু পরিবারের সন্তান। তার চাল-চলন, কর্থাবার্তা মেয়েলী স্বভাবের হওয়ায় এলাকার সবাই তাকে খুব পছন্দ করত। সেই সাথে মেয়েলী কন্ঠে কথা বলতে পারায় প্রতিবেশি হত্যাকান্ডের মূল হোতা আনছার আলী মেম্বারের মেয়ে মোছাঃ আফরুন নাহার ওরফে আফরিনা আক্তার স্বপনকে খুব পছন্দ করত। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে প্রেমের সর্ম্পক গড়ে উঠে। বিষয়টি আফরিনার মা জানতে পারলে স্বামী আনছার আলী মেম্বারকে অবগত করেন। এরপর তারা স্বপন চন্দ্র রায়কে শাসন-বারন করেন। তথাপি প্রেমের সর্ম্পক চলতে থাকলে আফরিনার বাবা আনছার আলী মেম্বার স্বপনকে হত্যা করার পরিকল্পনা করেন।
পরিকল্পনা মোতাবেক (গত ৭ জানুয়ারী) সন্ধ্যার পর বাড়িতে তার মা অসুস্থ্য থাকায় রান্না-বান্নার কাজে সহোযোগিতা করে স্বপন তার প্রতিবেশি বিরেন চন্দ্র রায়ের বাড়িতে গিয়ে আগুন তাপিয়ে প্রেমিকা আফরিনার সাথে দেখা করতে তার বাড়ির সামনে গেলে বিষয়টি আফরিনার মা দেখতে পেয়ে আফরিনার সাথে রাগারাগি করেন। আফরিনার বাবা আনছার মেম্বার বাড়িতে ফিরলে আফরিনার মা ঘটনার বিষয় আফরিনার বাবাকে জানায়। আফরিনার বাবা আনছার আলী মেম্বার এবং তার মা অমিজা বেগমদ্বয় তাদের সহযোগি প্রতিবেশি আসামী মোঃ আব্দুল মজিদ ওরফে উড়ি মজিদ (৪৮), মোঃ মাহবুবার রহমান (৩৯), ও শ্রী নরেশ চন্দ্র রায়(৪২), কে তাদের বাড়িতে ডেকে নিয়ে স্বপন চন্দ্র রায় হিন্দু হওয়ায় এবং তাদের মেয়ে মুসলিম হওয়ায় বিষয়টি মেনে নেয়ার মত নয় বিধায় তাকে হত্যার পরিকল্পনা করেন।
পরিকল্পনা মোতাবেক আসামী উড়ি মজিদ, মাহবুবার ও নরেশ চন্দ্র রায় গন ওইদিন রাত ৯টার দিকে স্বপন চন্দ্র রায়কে তার বাড়ির সামনের রাস্তা থেকে তুলে ঘটনাস্থলে নিয়ে যায়। আসামী আনছার আলী মেম্বার তার বাড়ি থেকে মাংস কাটার চাপাতি নিয়ে সেখানে হাজির হয়। আসামী মাহাবুবার স্বপনকে পিছন দিক থেকে পাঞ্জা করে ধরে। আসামী উড়ি মজিদ আনছার আলী মেম্বারের হাত থেকে চাপাতি নিয়ে স্বপনের মাথার মধ্যখানে স্ব-জোরে পর পর দুইটি কোপ দিলে স্বপন মাটিতে পরে যায়। আসামী নরেশ স্বপনের পা ঠেসে ধরে। পরে আনছার আলী আসামী উড়ি মজিদের হাত থেকে চা-পাতি নিয়ে মাথার বাম পার্শ্বে নৃশংস ভাবে আরো দুইটি কোপ দেয় এবং মাথার মগজ বের হয়ে আসলে ঘটনাস্থলেই স্বপনের মৃত্যু হয়।
পুলিশ যাতে বুঝতে না পারে সেজন্য আসামীগন পরামর্শ করে না পালিয়ে এলাকায় অবস্থান করে। পরের দিন লাশ দেখে লোকজন চিৎকার দিলে আসামী আনছার আলী মেম্বার ঘটনাস্থলে গিয়ে লালমনিরহাট সদর থানার অফিসার ইনচার্জ মাহফুজ আলমকে ফোন করে উক্ত বিষয় জানান এবং আসামীগণ সকলে ঘটনাস্থলে হাজির থেকে পুলিশকে প্রত্যক্ষাভাবে সহোযোগিতা করেন। পরবর্তীতে ঘটনাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য পুলিশকে নানা রকম বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রদান করেন তারা। কিন্তু পুলিশ বিচÿনতা দিয়ে ঘটনার মোটিভ উদ্ধারসহ উক্ত ক্লু-লেস মামলার রহস্য উদঘাটন করে হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত ৫ আসামীকে গ্রেফতার করেন। বর্তমানে আসামীগন লালমনিরহাট জেল হাজতে আটক আছেন।
সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, লালমনিরহাট সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মাহফুজ আলম, তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ পরিদর্শক(এসআই) মোঃ মোজাম্মেল হক ও পুলিশ পরিদর্শক(এসআই) মাইনুল ইসলাম।